logo

HOMOEOPATHY DOCTOR

📚 Home

রোকন সহায়িকা

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য দরস, বই নোট, বিষয়ভিত্তিক আয়াত-হাদিস ও মাসয়ালা সংকলন

📚 অনুশীলনী - ২৩ ডিসেম্বর ১ম ক্লাস )

# দারস তৈরী -সূরা হজ্ব (১ ও ২ নং আয়াত)) # বই নোট: ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলন # ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ সংক্রান্ত আয়াত # ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ সংক্রান্ত হাদিস #দাফন কাফন সংক্রান্ত সম্পর্কিত মাসায়েল

দারস তৈরী -সূরা হজ্ব (১ ও ২ নং আয়াত)

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُواْ رَبَّكُمْ‌ۚ إِنَّ زَلْزَلَةَ ٱلسَّاعَةِ شَىْءٌ عَظِيمٌ

يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّآ أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى ٱلنَّاسَ سُكَـٰرَىٰ وَمَا هُم بِسُكَـٰرَىٰ وَلَـٰكِنَّ عَذَابَ ٱللَّهِ شَدِيد

উচ্চারণ: "ইয়া-আইয়্যুহান-না-সুত ক্বূ রাব্বাকুম, ইন্না যালযালাতাস-সা-‘আতি শাইয়ুন ‘আজীম। ইয়াওমা তারাউনাহা তাযহালু কুল্লু মুরদি‘আতিন ‘আম্মা- আরদা‘আত ওয়া তয়াদ‘উ কুল্লু যা-তি হামলিন হামলাহা ওয়া তারান-না-সা সুকা-রা- ওয়া মা- হুম বিসুকা-রা- ওয়া লা-কিন্না ‘আযা-বাল্লা-হি শাদীদ।"

(১) হে মানবমন্ডলী! তোমরা ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে; (আর জেনে রেখো যে,) নিঃসন্দেহে কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ানক ব্যাপার। সেদিন তুমি দেখবে প্রতিটি দুগ্ধদায়িনী ভুলে যাবে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে, আর প্রত্যেক গর্ভবতী গর্ভপাত করে ফেলবে, আর মানুষকে দেখবে মাতাল, যদিও তারা প্রকৃতপক্ষে মাতাল নয়, কিন্তু আল্লাহর শাস্তি বড়ই কঠিন (যার কারণে তাদের ঐ অবস্থা ঘটবে)।

AI Overview

সূরা আল-হাজ্জ (সূরা আল-হাজ) সত্যের ২২তম সূরা, যার নামকরণ করা হয়েছেএর ২৭ নম্বর আয়াতের "وَأَذِّنْ فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ" উচ্চারণ: "ওয়া আযযিন ফিন-না-সি বিল হাজ্জি।" (মানুষের মধ্যে হজ্জের পরবর্তী দিন) অংশ থেকে, এই সূরাটি ও মাদানী বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে গঠিত এবং গঠন হজ্জের গুরুত্ব, ইতিহাস ও কার্যকর হুকুমের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

সূরা হজ্জের নামকরণের কারণসমূহ:

প্রধান কারণ: এই সূরা মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আ.)-কে মানবজাতির উদ্দেশ্যে হজ্জের আদেশ দিয়েছিলেন, তার উল্লেখ রয়েছে ।

বিষয়বস্তু: সূরার একটি অংশে হজ্জের বড় শান্তি, কাবা ঘরের ফজিলত এবং উদ্দেশ্যের উদ্দেশ্য করা হয়েছে ।

এটি প্রকাশের প্রবেশসূরা, যেখানে হজ্জের নির্দেশনা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর একটি আয়াত (২৭ নং) থেকে এই নাম গ্রহণ করা হয়েছে ।

নাম: আল-হাজ্জ (অর্থ: তীর্থযাত্রা/হজ্জ) ।

অবস্থান: ২২তম সূরা ।

আয়াত সংখ্যাঃ ৭৮টি ।

অবতীর্ণের সময়: মক্কী ও মাদানী সূরার সংমিশ্রণ, তবে অধিকাংশের নিজের একটি অংশ মক্কী ও অন্য অংশ মাদানী।

এছাড়াও, এই সুরা দু'টি সিজদা রয়েছে (১৮ ও ৭৭ নং আয়াতে)

নাযিলের সময় কাল

এর সূরায় মক্কী ও মাদানী সূরার বৈশিষ্ট মিলেমিশে আছে। এ কারণে মুফাসসিরগণের মাঝে এর মক্কী বা মাদানী হওয়া নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। কিন্তু আমার মতে এর একটি অংশ মক্কী যুগের শেষের দিকে এবং অন্য অংশটি মাদানী যুগের প্রথম দিকে নাযিল হবার কারণে এর বিষয়বস্তু ও বর্ণনাভংগীতে এ বিশেষ রূপ পরিগ্রহ করেছে। এজন্য উভয় যুগের বৈশিষ্ট এর মধ্যে একক হয়ে গেছে।

গোড়ার দিকের বিষয়বস্তু ও বর্ণনাভংগী থেকে পরিস্কার জানা যায় যে, এটি মক্কায় নাযিল হয়েছে। এ ব্যাপারে বেশী নিশ্চয়তার সাথে বলা যেতে পারে যে, এ অংশটি মক্কী জীবনের শেষ যুগে হিজরতের কিছু পূর্বে নাযিল হয়েছে। এ অংশটি ২৪ আয়াত

وَهُدُوٓاْ إِلَى ٱلطَّيِّبِ مِنَ ٱلْقَوْلِ وَهُدُوٓاْ إِلَىٰ صِرَٲطِ ٱلْحَمِيد

উচ্চারণ: "ওয়া হুদূইলাল তায়্যিবি মিনাল ক্বাওলি ওয়া হুদূ ইলা- ছিরা-তিল হামীদ।" এ এসে শেষ হয়ে গেছে।

এরপর থেকে হঠাৎ বিষয়বস্তুর প্রকৃতি পাল্টে গেছে এবং পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে যে, এখান থেকে শেষ পর্যন্তকার অংশটি মদীনা তাইয়েবায় নাযিল হয়েছে। এ অংশটি যে, হিজরতের পর প্রথম বছরেই যিলহজ্জ মাসে নাযিল হয়েছে তা মনে করাটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ২৫ থেকে ৪১ আয়াত পর্যন্ত যে বিষয়বস্তু উপস্থাপিত হয়েছে তা এ কথাই নির্দেশ করে এবং ৩৯-৪০ আয়াতে শানেনুযুল তথা নাযিলের কার্যকারণও এর প্রতি সমর্থন দেয়। সে সময় মুহাজিররা সবেমাত্র নিজেদের জন্মভূমি ও বাড়িঘর ছেড়ে মদীনায় এসেছিলেন। হজ্জের সময় তাদের নিজেদের শহর ও হজ্জের সমাবেশের কথা মনে পড়ে থাকতে পারে। কুরাইশ মুশরিকরা যে, তাদের মসজিদে হারামে যাবার পথ বন্ধ করে দিয়েছে একথা তদের মনকে মারাত্মকভাবে তোলপাড় করে থাকবে। যে অত্যাচারী কুরাইশ গোষ্ঠী ইতিপূর্বে তাদেরকে নিজেদের ঘর থেকে বের করে দিয়েছে, মসজিদে হারামের যিয়ারত থেকে বঞ্চিত করেছে এবং আল্লাহর পথ অবলম্ম^ন করার জন্য তাদের জীবন পর্যন্ত দুর্বিসহ করে তুলেছে, তাদের বিরুদ্ধে মুসলমানরা হয়তো যুদ্ধ করারও অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। এ ছিল এ আয়াতগুলোর নাযিলের যথার্থ মনস্তাত্বিক পটভূমি।

এখানে প্রথমে হজ্জের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দুনিয়ায় একমাত্র আল্লাহর বন্দেগী করার জন্য মসজিদে হারাম নির্মাণ এবং হজ্জের পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু আজ সেখানে শিরক করা হচ্ছে এবং এক আল্লাহর ইবাদাতকারীদের জন্য তার পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এরপর দুরাচারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার এবং এদেরকে বেদখল করে দেশে এমন একটি কল্যাণমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মুসলমানদেরকে অনুমতি দেয়া হয়েছে যেখানে অসৎবৃত্তি প্রদমিত ও সৎবৃত্তি বিকশিত হবে। ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, উরওয়াহ ইবনে যুবাইর, যায়েদ ইবনে আসলাম, মুকাতিল ইবনে হাইয়ান, কাতাদাহ ও অন্যান্য মুফাসসিরগণের মতে মুসলমানদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দান সম্পর্কিত এটিই প্রথম আয়াত। অন্যদিকে হাদীস ও সীরাতের বর্ণনাসমূহ থেকে প্রমাণ হয়, এর অনুমতির পরপরই কুরাইশদের বিরুদ্ধে বাস্তব কর্মতৎপরতা শুরু করা হয় এবং দ্বিতীয় হিজরীর সফর মাসে লোহিত সাগরের দিকে প্রথম অভিযান পরিচালনা করা হয়। এটি দাওয়ান যুদ্ধ বা আবওয়া যুদ্ধ নামে পরিচিত।

বিষয়বস্তু ও কেন্দ্রীয় আলোচ্য:

এ সূরায় তিনটি দলকে সম্মোধন করা হয়েছেঃ মক্কার মুশরিক সমাজ, দ্বিধাগ্রস্ত ও দোটানায় পড়ে থাকা মুসলিমগণ এবং আপোষহীন সত্যনিষ্ঠ মু’মিন সমাজ।

মুশরিকদেরকে সম্বোধন করার পর্বটি মক্কায় শুরু হয়েছে এবং মদীনায় এর সমাপ্তি ঘটানো হয়েছে। এ সম্বোধনের মাধ্যমে তাদেরকে বজ্রকন্ঠে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, তোমরা হঠকারিতা ও জিদের বশবর্তী হয়ে নিজেদের ভিত্তিহীন জাহিলী চিস্তাধারার ওপর জোর দিয়েছো, আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সব মাবুদদের ওপর ভরসা করেছো যাদের কাছে কোন শক্তি নেই এবং আল্লাহর রসূলকে মিথ্যা বলেছো। এখন তোমাদের পূর্বে এ নীতি অবলম্বনকারীরা যে পরিণতির সম্মুখীন হয়েছে তোমাদেরও অনিবার্যভাবে সে একই পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে। নবীকে অমান্য করে এবং নিজের জাতির সবচেয়ে সৎলোকদেরকে জুলুম নিপীড়নের শিকারে পরিণত করে তোমরা নিজেদেরই ক্ষতি করেছো। এর ফলে তোমাদের ওপর আল্লাহর যে গযব নাযিল হবে তা থেকে তোমাদের বানোয়াট উপাস্যরা তোমাদের রক্ষা করতে পারবে না। এ সতর্কীকরণ ও ভীতি প্রদর্শনের সাথে সাথে বুঝাবার ও উপলদ্ধি করাবার কাজও চলেছে। সমগ্র সূরার বিভিন্ন জায়গায় স্মরণ করিয়ে দেয়া ও উপদেশ প্রদানের কাজও চলেছে। এ সংগে শিরকের বিরুদ্ধে এবং তাওহীদ ও আখেরাতের পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি প্রমাণও পেশ করা হয়েছে।

দ্বিধান্বিত মুসলমানরা, যারা আল্লাহর বন্দেগী গ্রহণ করেছিল ঠিকই কিন্তু তাঁর পথে কোন প্রকার বিপদের মোকাবিলা করতে রাজি ছিল না, তাদেরকে সম্বোধন করে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করা ও ধমক দেয়া হয়েছে। তাদেরকে বলা হয়েছে, এটা কেমন ঈমান! আরাম, আয়েশ, আনন্দ ও সুখ লাভ হলে তখন আল্লাহ তোমাদের আল্লাহ থাকে এবং তোমরা তাঁর বান্দা থাকো, কিন্তু যখনই আল্লাহর পথে বিপদ আসে এবং কঠিন সংকটের মোকাবিলা করতে হয় তখনই আল্লাহ আর তোমাদের আল্লাহ থাকে না এবং তোমরাও তাঁর বান্দা থাকো না। অথচ নিজেদের এ নীতি ও কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে তোমরা এমন কোন বিপদ, ক্ষতি ও কষ্টের হাত থেকে রেহাই পেতে পারবে না, যা আল্লাহ তোমাদের ভাগ্যে লিখে দিয়েছেন।

ঈমানদারদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দান করা হয়েছে দু’টি পদ্ধতিতে। একটি ভাষণে সম্বোধন এমনভাবে করা হয়েছে যার লক্ষ্য তারা নিজেরাও এবং এ সংগে আরবের সাধারণ জনসমাজও। আর দ্বিতীয় ভাষণটির লক্ষ্য কেবলমাত্র মু’মিনগণ।

প্রথম ভাষনে মক্কার মুশরিকদের মনোভাব ও কর্মনীতির সমালোচনা করা হয়েছ। বলা হয়েছে তারা মুসলমানদের জন্য মসজিদে হারামের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ মসজিদে হরাম তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। কাজেই কাউকে হজ্জ করার পথে বাধা দেবার অধিকার তাদের নেই। এ আপত্তি শুধু যে, যথার্থই ছিল তাই নয় বরং রাজনৈতিক দিক দিয়ে এটি কুরাইশদের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তম অস্ত্রও ছিল। এর মাধ্যমে আরবের অন্যান্য সকল গোত্রের মনে এ প্রশ্ন সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে যে, কুরাইশরা হারাম শরীফের খাদেম, না মালিক? আজ যদি তারা নিজেদের ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে একটি দলকে হজ্জ করতে বাধা দেয় এবং তাদের এ পদক্ষেপকে মেনে নেয়া হয়, তাহলে কালকেই যে তারা যার সাথে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে তাকে হারাম শরীফের সীমানায় প্রবেশ করতে বাধা দেবে না এবং এবং তার উমরাহ ও হজ্জ বন্ধ করে দেবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? এ প্রসংগে মসজিদুল হারামের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে একদিকে বলা হয়েছে যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহর হুকুমে এ ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন তখন সবাইকে এ ঘরে হজ্জ করার সাধারণ অনুমতি দিয়েছিলেন। প্রথম দিন থেকেই সেখানে স্থানীয় অধিবাসী ও বহিরাগতদের সমান অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে বলা হয়েছে, এ ঘরটি শিরক করার জন্য নয় বরং এক আল্লাহর বন্দেগী করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। অথচ কী ভয়ংকর কথা! আজ সেখানে এক আল্লাহর বন্দেগী নিষিদ্ধ কিন্তু মূর্তি ও দেবদেবীর পূজার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।

দ্বিতীয় ভাষণে মুসলমানদেরকে কুরাইশদের জুলুমের জবাবে শক্তি প্রয়োগ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ সংগে মুসলমানরা যখন কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা লাভ করবে তখন তাদের নীতি কি হবে এবং নিজেদের রাষ্ট্রে তাদের কি উদ্দেশ্যে কাজ করতে হবে এ কথাও তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়টি সূরার মাঝখানে আছে এবং শেষেও আছে। শেষে ঈমানদারদের দলের জন্য “মুসলিম” নামটির যথারীতি ঘোষণা দিয়ে বলা হয়েছে, তোমরাই হচ্ছো ইবরাহীমের আসল স্থলাভিষিক্ত। তোমরা দুনিয়ায় মানব জাতির সামনে সাক্ষদানকারীর স্থানে দাঁড়িয়ে আছো, এ দায়িত্ব পালন করার জন্য তোমাদেরকে বাছাই করে নেয়া হয়েছে। এখন তোমাদের নামায কায়েম যাকাত দান ও সৎকাজ করে নিজেদের জীবনকে সর্বোত্তম আদর্শ জীবনে পরিণত করা এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল হয়ে আল্লাহর কলেমাকে বুলন্দ করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালানো উচিত।

ব্যখ্যা:

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُواْ رَبَّكُمْ‌ۚ إِنَّ زَلْزَلَةَ ٱلسَّاعَةِ شَىْءٌ عَظِيمٌ

উচ্চারণ: "ইয়া-আইয়্যুহান-না-সুত ক্বূ রাব্বাকুম, ইন্না যালযালাতাস-সা-‘আতি শাইয়ুন ‘আজীম।

(১) হে মানবমন্ডলী! তোমরা ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে; (আর জেনে রেখো যে,) নিঃসন্দেহে কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ানক ব্যাপার।

এ প্রকম্পন হবে কিয়ামতের প্রাথমিক অবস্থার প্রকাশ আর সম্ভবত এটা এমন সময় শুরু হবে যখন যমীন অকস্মাৎ উল্টে পড়তে শুরু করবে এবং সূর্য পূর্বদিকের পরিবর্তে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে। একথাই বর্ণনা করেছেন প্রাচীন তাফসীরকারদের মধ্য থেকে আলকামাহ ও শা’বী। তারা বলেছেনঃ

يكون ذلك عند طُلُوعُ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا

উচ্চারণ: "ইয়াকূনু যা-লিকা ‘ইনদা তুলূ‘ইশ-শামসি মিম মাগরিবিহা-।" ইবনে জারীর, তাবারানী, ইবনে আবী হাতেম প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ হযরত আবু হুরাইরা(রা.) থেকে যে দীর্ঘ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তা থেকে একথাটিই জানা যায়। সেখানে নবী ﷺ বলেছেনঃ তিনবার সিংগায় ফুঁক দেয়া হবে। এক ফুঁক হবে “ফাযা” তথা ভীতি উৎপাদনকারী, দ্বিতীয় ফূঁক “সা’আক” তথা সংজ্ঞা লোপকারী বিকট গর্জন এবং তৃতীয় ফুঁক হবে “কিয়াম লি-রাব্বিল আলামীন” অর্থাৎ রব্বুল আলামীনের সামনে হাজির হবার ফূঁক।

প্রথম ফুঁকটি সাধারণ বিভীষিকার সৃষ্টি করবে এবং মানুষ হতভম্ভ হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় ফুঁকে সবাই মরে পড়ে যাবে।

তৃতীয় ফুঁকের পর সবাই জীবিত হয়ে আল্লাহর সামনে হাজির হবে।

তারপর প্রথম ফুঁকের বিস্তারিত অবস্থা বর্ণনা করে তিনি বলেছেন, সে সময় পৃথিবীর অবস্থা হবে এমন একটি নৌকার মতো যা ঢেউয়ের আঘাতে টলমল করছে অথবা এমন ঝুলন্ত প্রদীপের মতো যা বাতাসের ঝটকায় প্রচণ্ডভাবে দুলছে। সে সময় পৃথিবী পৃষ্ঠে বসতকারীরা যে অবস্থার সম্মুখীন হবে তার চিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে অংকন করা হয়েছে। যেমনঃ

فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّورِ نَفْخَةٌ وَاحِدَةٌ - وَحُمِلَتِ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً وَاحِدَةً - فَيَوْمَئِذٍ وَقَعَتِ الْوَاقِعَةُ

উচ্চারণ: "ফাইযা- নুফিখা ফিছ-ছূরি নাফখাতুওঁ ওয়া-হিদাহ্। ওয়া হুমিলাতিল আরদু ওয়াল জিবা-লু ফাদুক্কাতা- দাক্কাতুওঁ ওয়া-হিদাহ্। ফাইয়াওমাইযিন ওয়া ক্বা‘আতিল ওয়া-ক্বি‘আহ্।"

“যখন সিংগায় এক ফুঁক দেয়া হবে এবং যমীন ও পাহাড় তুলে এক আঘাতে ভেঙে দেয়া হবে তখন সে বিরাট ঘটনাটি ঘটে যাবে।” (আল হা-ক্কাহ ১৩-১৫)

إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا - وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا - وَقَالَ الْإِنْسَانُ مَا لَهَا

উচ্চারণ: "ইযা- যুলযিলাতিল আরদু যিলযা-লাহা-। ওয়া আখরাজাতিল আরদু আছক্বা-লাহা-। ওয়া ক্বা-লাল ইনসা-নু মা- লাহা-।" “যখন পৃথিবীকে পুরোপুরি প্রকম্পিত করে দেয়া হবে এবং সে তার পেটের বোঝা বের করে ছুঁড়ে ফেলে দেবে আর মানুষ বলবে, এর কি হলো? ” (আয যিলযাল ১-৩)

يَوْمَ تَرْجُفُ الرَّاجِفَةُ - تَتْبَعُهَا الرَّادِفَةُ - قُلُوبٌ يَوْمَئِذٍ وَاجِفَةٌ - أَبْصَارُهَا خَاشِعَةٌ

উচ্চারণ: "ইয়াওমা তারজুফুর রা-জিফাহ্। তাতবা‘উহার রা-দিফাহ্। ক্বুলূবুইঁ ইয়াওমাইযিঁও ওয়া-জিফাহ্। আবছ-রুহা- খ-শি‘আহ্।" “যেদিন প্রকম্পনের একটি ঝটকা একেবারে নাড়িয়ে দেবে এবং এরপর আসবে দ্বিতীয় ঝটকা। সেদিন অন্তর কাঁপতে থাকবে এবং দৃষ্টি ভীতি বিহ্বল হবে।” (আন নাযিআত ৫-৯)

إِذَا رُجَّتِ الْأَرْضُ رَجًّا - وَبُسَّتِ الْجِبَالُ بَسًّا - فَكَانَتْ هَبَاءً مُنْبَثًّا

উচ্চারণ: ""ইযা- রুজ্জাতিল আরদু রাজ্জা-। ওয়া বুস্সাতিল জিবা-লু বাস্সা-। ফাকা-নাত হাবাহ্ আম মুমবাছ্ছা-।" “যেদিন পৃথিবীকে মারাত্মকভাবে ঝাঁকিয়ে দেয়া হবে এবং পাহাড় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ধূলির মতো উড়তে থাকবে।” (আল ওয়াকিআহ, আয়াত-৪-৬)

فَكَيْفَ تَتَّقُونَ إِنْ كَفَرْتُمْ يَوْمًا يَجْعَلُ الْوِلْدَانَ شِيبًا - السَّمَاءُ مُنْفَطِرٌ بِهِ

উচ্চারণ: ""ফাকাইফা তাত্তাক্বূনা ইন কাফারতুম ইয়াওমাইঁ ইয়াজ‘আলুল উইলদা-না শীবা-। আসসামা-উ মুনফাতীরুম বিহী।" “যদি তোমরা নবীর কথা না মানো, তাহলে কেমন করে রক্ষা পাবে সেদিনের বিপদ থেকে, যা বাচ্চাদেরকে বুড়া করে দেবে এবং যার প্রচণ্ডতায় আকাশ ফেটে চৌচির হয়ে যাবে? ” (আল মুযযাম্মিল, আয়াত-১৭-১৮)

যদিও কোন কোন মোফাসসিরের মতে এ কম্পনটি হবে এমন সময়ে যখন মৃতরা জীবিত হয়ে নিজেদের রবের সামনে হাজির হবে এবং এর সমর্থনে তাঁরা একাধিক হাদীসও উদ্ধৃত করেছেন তবুও কুরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনা এব হাদীস গ্রহণ করার পথে বাধা। কুরআন এর যে সময় বর্ণনা করেছে তা হচ্ছে এমন এক সময় যখন মায়েরা শিশু সন্তানদের দুধ পান করাতে করাতে তাদেরকে ফেলে রেখে পালাতে থাকবে এবং গর্ভবতীদের গর্ভপাত হয়ে যাবে। এখন একথা সুস্পষ্ট যে, আখেরাতের জীবনে কোন মহিলা তার শিশুকে দুধ পান করাবে না এবং কোন গর্ভবতীর গর্ভপাত হবার কোন সুযোগও সেখানে থাকবে না। কারণ, কুরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী সেখানে সবরকমের সম্পর্ক খতম হয়ে যাবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত মর্যাদা নিয়ে আল্লাহর সামনে হিসেব দিতে দাঁড়াবে। কাজেই আমি পূর্বেই যে হাদীস উদ্ধৃত করেছি সেটিই অগ্রাধিকার লাভের যোগ্য। যদিও তার বর্ণনা পরম্মúরা দুর্বল কিন্তু কুরআনের সমর্থন তার দুর্বলতা দূর করে দেয়। অন্যদিকে অন্যান্য হাদীসগুলো বর্ণনা পরম্মúরার দিক দিয়ে বেশী শক্তিশালী হলেও কুরআনের বর্ণনার সাথে গরমিল থাকায় এগুলোকে দুর্বল করে দেয়। (তাফহীমুল কুরআন)

يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّآ أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى ٱلنَّاسَ سُكَـٰرَىٰ وَمَا هُم بِسُكَـٰرَىٰ وَلَـٰكِنَّ عَذَابَ ٱللَّهِ شَدِيد

উচ্চারণ: ""ইয়াওমা তারাওনাহা তাযহালু কুল্লু মুরদি‘আতিন ‘আম্মা- আরদা‘আত ওয়া তাদা‘উ কুল্লু যা-তি হামলিন হামলাহা ওয়া তারান-না-সা সুকা-রা- ওয়া মা- হুম বিসুকা-রা- ওয়া লা-কিন্না ‘আযা-বাল্লা-হি শাদীদ।"

(২) সেদিন তুমি দেখবে প্রতিটি দুগ্ধদায়িনী ভুলে যাবে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে, আর প্রত্যেক গর্ভবতী গর্ভপাত করে ফেলবে, আর মানুষকে দেখবে মাতাল, যদিও তারা প্রকৃতপক্ষে মাতাল নয়, কিন্তু আল্লাহর শাস্তি বড়ই কঠিন (যার কারণে তাদের ঐ অবস্থা ঘটবে)।

পূর্বোক্ত আয়াতে যে প্রকম্পনের কথা বলা হয়েছে যার পরিণতি এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যার অর্থঃ মানুষের মধ্যে কঠিন ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে। আর এটি ঘটবে ঠিক কিয়ামতের পূর্বমুহূর্তে, আর তার পরই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। অথবা এ ঘটনা কিয়ামতের ( জন্য শিঙ্গায় ফুৎকার করার ) পর ঐ সময় ঘটবে, যখন মানুষ কবর হতে উঠে হাশরের ময়দানে জমায়েত হবে।

অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারিগণ দ্বিতীয় অর্থ নিয়েছেন। আর তার সমর্থনে কিছু হাদীস পেশ করেন, যেমন মহান আল্লাহ আদম (আঃ )-কে আদেশ করবেন যে, যেন তিনি নিজ সন্তানদের মধ্য হতে হাজারে ৯৯৯ জনকে জাহান্নামের জন্য বের করে দেন। এই কথা শুনে গর্ভবতীরা তাদের গর্ভপাত করে ফেলবে, বালকরা বৃদ্ধ হয়ে পড়বে, আর মানুষকে দেখে মাতাল মনে হবে, অথচ তারা আসলে মাতাল হবে না; বরং আল্লাহর আযাবের ভয়াবহতার জন্য এ রকম ( কিংকর্তব্যবিমূঢ় ) হবে।

সাহাবাদের কাছে এ কথা অত্যন্ত ভারী মনে হল, তাদের চেহারার রং পাল্টে গেল। নবী ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) তা দেখে বললেন ভয়ের কিছু নেই। ৯৯৯ জনের সংখ্যা য়্যা'জূজ-মা'জূজের মধ্য হতে হবে আর তোমাদের মাত্র একজন। তোমাদের সংখ্যা অন্য মানুষদের তুলনায় এমন হবে, যেমন সাদা গরুর গায়ে একটি কালো লোম অথবা কালো গরুর গায়ে একটি সাদা লোম। আর আমি আশা করি যে, তোমরাই হবে জান্নাতের এক চতুর্থাংশ বা এক তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক। তা শুনে সাহাবারা আনন্দে 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি উচ্চারিত করলেন। ( সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা হাজ্জ )

প্রথম বক্তব্যও অমূলক নয়। কিছু দুর্বল হাদীস দ্বারা তার সমর্থন পাওয়া যায়। তাছাড়া প্রকম্পন হেতু ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ার কথাই এখানে স্পষ্ট। অবশ্য একই শ্রেণীর ভয় ও আতঙ্ক উভয় সময়েই হবে। সেই জন্য দু'টি মতই সঠিক হতে পারে। কারণ, দুই সময়েই মানুষের অবস্থা হবে সে রকমই হবে, যে রকম উক্ত আয়াত ও সহীহ বুখারীর বর্ণনায় বলা হয়েছে। [ তাফসীরে আহসানুল বায়ান]

শিক্ষা:

১. কি¦য়ামাত অতি নিকটে, তাই সে ব্যপারে আমলিয়াতের প্রস্তুতি নিতে হবে।

২. তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জনে নিজেকে নিয়োজিত রাখা ।

৩. যে যাই বলুক, ক্বিয়ামাতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।

৪. আল্লাহুম্মা ইন্নী আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুজনী, ওয়া আউজুবিকা মিনাল বুখলী ওয়াল যুবনী, ওয়া আউজুবিকা মিনাল ইয্যী ওয়াল কাসলি, ওয়া আউজুবিকা মিন গলাবাতিত দাইনি ওয়া কাহরি রিজাল ওয়া আউজুবিকা মিনাল ফিতনাতি মাসিহী দাজ্জাল।

Top


বই: ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলন

সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী (র:)

জীবন সম্পর্কে চারটি মতবাদ:

দুনিয়ায় যতগুলো জীবন বিধান আছে তার প্রত্যেকটি এই চারটি অতি-প্রাকৃত মতবাদের যে কোন একটিকে অবশ্যই গ্রহন করেছে।

***নির্ভেজাল জাহেলিয়াত:

বৈশিষ্ট্য:

= মাধ্যম বা পন্থা: বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ের উপর ভিত্তি করে উত্তর খোজার প্রচেষ্টা।

= বিশ্বজাহান সৃষ্টি: আকষ্মিকভাবে সৃষ্টি হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় ও অপরিকল্পিত ভাবে পরিচালিত এবং আপনা আপনি ধ্বংস হয়ে যাবে।

= বিশ্বপ্রকৃতির কোন সত্ত্বাধিকারী নেই, থাকলেও মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্কহীন।

= দুনিয়া ব্যবহার নীতি: সমগ্র দুনিয়া বিভিন্ন দ্রব্য সামগ্রীর ভান্ডার। নিজের ইচ্ছেমতো মানুষ হস্তগত করবে ও ব্যবহার করবে। কোন জবাবদিহি করতে হবে না।


আইনবিধান ও জবাবদিহিতা:

ক) জীবন যাত্রা নির্বাহের জন্য আইনের কোন উৎস না থাকায় নিজের আইন নিজেরাই তৈরি করে।

খ) কারও নিকট জবাবদিহিতা নেই। যদি করতেই হয় তবে নিজ সমাজনেতা বা রাষ্ট্রশক্তির নিকট জবাবদিহি করতে হবে।

গ) দুনিয়ায় প্রকাশিত ফলাফলের ভিত্তিতে ভুল ও নিভর্ল ক্ষতিকর ও লাভজনক এবং গ্রহনযোগ্য ও অগ্রহনযোগ্য মিমাংসা করা হবে।


ফলাফল:

= মানুষের স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচারী জীবন:

ক) মানুষ পুরোপুরি স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচারী এবং তার কর্মনীতি সম্পূর্ণ দায়িত্বহীন।

খ) নিজেকে দেহ এবং দৈহিক শক্তির একচ্ছত্র মালিক মনে করে এবং ইচ্ছেমতো এর ব্যবহার করে।

গ) যে বস্তু তার করায়ত্ত্ব ঘটে তার উপর কতর্ত্ব স্থাপন।


নৈতিক মূল্যবোধের অনুপস্থিতি:

ক) তার হৃদয়মনে নৈতিক অনুভূতি, দায়িত্বাজ্ঞান ও জবাবদিহিতার কোন ভয় থাকে না।

খ) সাধারন অত্যাচারী, বিশ্বাসঘাতক ও দুনিয়াপরায়ন হয়।

গ)প্রত্যেক মানুষ একজন জাতীয়তাবাদীর ভূমিকা পালন করে।

ঘ) আত্নত্যাগ ও আত্নদানের ভাবধারা এবং একধরনের দায়িত্বপূর্ণ নৈতিক অনুভূতির পরিচয় দেয়া গেলেও মূলত: তা স্বার্থপরতা ও আত্নম্ভরিতার সম্প্রসারিত রুপ।


নির্ভেজাল জাহেলিয়াতের মূলকথা:

১. বিশ্ব জাহানের ব্যবস্থাবলী একটি আকর্ষিক ঘটনার বাস্তব প্রকাশ।

২. মানুষ এক ধরনের পাশবিক বা জৈবিক সত্তা ঘটনাক্রমে তার উদ্ভব হয়েছে।


পৃথিবী সম্পর্কে ধারনা:

১. এর কোন স্রষ্টা নেই। আর থাকলেও তার সাথে মানব জীবনের সংগে কোন সম্পর্ক নেই।

২. এমনকি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইচ্ছা তৈরি হয়েছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে একদিন হঠাৎ কোন কার্যকারিতা ছাড়াই ধ্বংস হবে।


***শির্ক মিশ্রিত জাহেলিয়াত:

বিশ্ব জাহানের এ ব্যবস্থা কোন ঘটনাক্রমিকপ্রকাশ নয় এবং খোদাহীন অস্তিত্বের অধিকারী ও নয়। এর একটি খোদা নয় বরং বহু খোদা বর্তমান। তারা একেকজন সৃষ্টির একেকটি বিষয় দেখাশুনা করে।


বৈশিষ্ট্য:

= বৈজ্ঞানিক প্রমানভিত্তিক নয়। নিছক কল্পনা নির্ভর।

= উৎস:- ভয় ও ক্ষমতা থেকে এর সৃষ্টি। অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক কোন কিছু দেখলেই তাতে কল্পিত ক্ষমতা রোপ ও পূজা আরম্ভ করে।

= ফেরেশতা, জ্বীন, পাহাড়, নক্ষত্র, আগুন, নদী ইত্যাদিকে দেবতায় পরিনত করেছে।

= আল্লাহর ধারনা এমন ভাবে প্রতিষ্টিত করেছে যেন আল্লাহ একজন বাদশাহ এবং অন্যান্য খোদারা তার উজির ও নজির। দরবারী, মোসাহেব ও কর্মচারী পর্যায়ের মানুষ সরাসরি সেই নামদার বাদশাহ পর্যন্ত পৌছাতে অক্ষম। তাই অধীনস্ত খোদাদের সাথে পুঁজোর মাধ্যমে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে।


ফলাফল:

= অতিপ্রাকৃতিক শক্তিতে বিশ্বাসের কারনে অবাস্তব আশ্রয় ও অবাস্তব ভয়ে পুঁজের মাধ্যমে বিপুল পরিমান শক্তি অর্থহীনভাবে অপচয় করে।

= অঙ্গ লোকেরা মুশরিকদের খোদাকে পরিত্যাগ করে যাদের গোটা জীবন কেটেছে শিরক এর বিরুদ্ধে যেমন: ওলি, শহীদ, দরবেশ, গওস, কুতুব, ওলামা, পীর আল্লাহর এ সব নেক বান্দাদের খোদার আসনে প্রতিষ্টিত করেছে।

= মুশরিদের ন্যায় পুজা অর্চনার পরিবর্তে ফাতেহা খানি জেয়ারত, নজর-নিয়াজ, উরস, চাদর-চড়ানো, তাজিয়া করা ইত্যাদি নিয়ে নতুন শরীয়ত তৈরি করা হয়েছে।

= কোন তত্বগত দলিলপ্রমান ছাড়া ঐ সব নেক লোকদের জম্ম-মৃত্যু, আভির্বাব-তিরোভাব, কাশফ-কেরামত, ক্ষমতা-কর্তৃত্ব এবং আল্লাহর দরবারে তাদের নৈকট্যের ধরন সম্পর্কে পৌত্তালিক মুশরিকদের পৌরানিকবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল একটি পৌরানিকবাদ তৈরি করা হয়েছে।

= ওসিলা রুহানী মদদ ফয়েজ ইত্যাদি শব্দগুলোর সুদৃশ্য আচরনের আড়ালে আল্লাহ ও বান্দাহদের মধ্যকার সম্পর্ককে ঐ সব নেক লোকদের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে।

= মুশরিকদের সাথে ঐসব মুসলমানদের পার্থক্য এই যে, তারা আল্লাহর এসব নিচের স্তরের কর্মকর্তাদেও প্রকাশ্যে আর এসব মুসলমানেরা গওস, কুতুব, আবদাল ওলী আল্লাহ প্রভৃতি শব্দের আবরনে এদেরকে ঢেকে রাখে।


নির্ভেজাল ও শিরক মিশ্রিত জাহেলিয়াতের পার্থক্য:

১. শিরকে পূজা, মানত, অর্ঘ্য ইত্যাদি অনুষ্ঠানের আধিক্য কিন্তু নির্ভেজাল জাহেলিয়াতে এসব নেই।

২. নৈতিক চরিত্র ও কর্মের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

৩. শিক্ষা, শিল্প, দর্শন, সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, নির্ভেজাল ইত্যাদির জন্য কোন মূলনীতি শিরকে নেই। তাই নির্ভেজাল জাহেলিয়াত থেকে তা গ্রহন করে।

৪. মুশরিকরা কল্পনাবিলাসী। নির্ভেজাল বাস্তবধর্মী।

৫. শিরকের রাজ্যে রাজা ও ধর্মীয় নেতাগন খোদার আসনেপ্রতিষ্ঠিত। বংশ এবং শ্রেনীরপ্রাধান্যের উপর এ মতবাদপ্রতিষ্ঠিত। নির্ভেজাল রাজত্বে পরিবার পূজা, বংশ পূজা, একনায়কতন্ত্র, সামাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, শ্রেণী সংগ্রামের রুপ ধারন করে।


*** বৈরাগ্যবাদী জাহেলিয়াত:

বাস্তব পর্যবেক্ষনের সাথে আন্দাজ অনুমানের সংমিশ্রনে মানব জীবনের মৌলিক প্রশ্নসমূহের উত্তর ঠিক করাকে বৈরাগ্যবাদ বলে অভিহিত করা হয়।


বৈশিষ্ট্য:

= পৃথিবী ও মানুষের শারীরিক সত্ত্বা স্বয়ং মানুষের জন্য একটি শাস্তিকেন্দ্র। মানুষের আত্নাকে দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদীর ন্যায় পিঞ্জিরাবদ্ধ করে রাখা হয়।

= ইন্দ্রিয়ের সকলপ্রয়োজন ও বাসনা বন্দীখানার শৃঙ্খলের ন্যায়।

= নাযাত লাভের উপায় হচ্ছেপ্রকৃতিগত বিভিন্নপ্রয়োজনকে কঠোরভাবে অবদমিত করা।

= সকলপ্রকার আনন্দ-উচ্ছাস, স্বাধ-আস্বাধন পরিহার এবং দেহ মনের কঠোর বৃদ্ধি সাধণ।

= স্রষ্টার অস্তিত্ব ও মৌলিক ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই।


ফলাফল:

= সৎ ও ধর্মভীরু লোকদেরকে দুনিয়ার ঝামেলা মুক্ত করে নির্ভেজাল করে তোলে, মানে দুষ্ট ও অসৎপ্রকৃতির লোকেরা কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা দখল করে ফিৎনা, ফাসাদ সৃষ্টি করে।

= জনগনের মধ্যে অবাঞ্জিত ধৈর্য্য, সহিঞ্চতা ও নৈরাশ্যবাদী দৃষ্টি ভঙ্গির সৃষ্টি হয়। এতে করে রাজা, বাদশাহ, আমীর, ওমরাহ ও ধর্মীয় কর্তত্বশালী শ্রেনী জনগনের উপরপ্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়।

= দুনিয়াকে পরিক্ষাস্থল, কর্মস্থল, পরকালের কৃষিক্ষেত্রের পরিবর্তে “দারুল আযাব” ও “মায়াজাল” হিসেবে উপস্থাপন করে। ফলে মানুষ পৃতিবীতে নিজেরপ্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব ভুলে যায় এবং দুনিয়া থেকে নিজের গাঁ বাঁচিয়ে চলতে চায়।

= উম্মতের একটি অংশকে মোকাবেলা, মোশাহাদা, কাশফ-বিরাজাত, চিল্লাদান, ওজিফাপাঠ, আমালিয়াত ব্যাখ্যার নফল আদায়ের ব্যাপারে ফরযের চেয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ে।

= দ্বীনের নির্দেশের ব্যাপারে অযথা বাড়াবাড়ি ছোটখাট জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরিমাপ করা। খুঁটিনাটি বিষয়ে অস্বাভাবিক মনোযোগ ও যত্ন নেয়ার রোগ জন্ম নিয়েছে।


***ইসলাম

মানুষ ও বিশ্বপ্রকৃতি সম্পরর্কে মৌলিক প্রশ্নসমূহের যে জওয়াব আল্লাহ প্রেরিত নবীগন দিয়েছেন, তা আন্তরিকতা সহকারে পূর্ণরূপে গ্রহন করার নামই ইসলাম।


মানুষ ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে নবীদের মতে:

১. এ মহাবিশ্ব এর প্রতিটি সৃষ্টি সব কিছুর স্রষ্টা আল্লাহ। তিনিই এর একমাত্র শাসক ও পরিচালক। সবকিছুই তারই ক্ষমতার অধীন।

২. মানুষ সম্পর্কিত: মানুষ বিশ্বপ্রকৃতির একটি অংশ এবং জন্মগতপ্রজা। এটি মানুষের ইচ্ছাধীন নয়। মানুষ ইচ্ছে করলেও এর বাহিরে যেতে পারে না।

৩. মানুষের দায়িত্ব: সৃষ্টিকর্তার আনুগত্য করা, এর পক্ষ থেকে আগত প্রত্যেক নির্দেশ পালন করা।

৪. মানুষকে পরিক্ষা করার জন্য জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক এবং স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে।

৫. আল্লাহর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে তার জন্যে রয়েছে পুরস্কার এবং না করলে রয়েছে শাস্তি।

৬. তাৎক্ষনিকভাবে যদি শাস্তি নাও হয় তবে আখেরাতে চূড়ান্ত শাস্তি হবে।


*** মুজাদ্দিদ কাকে বলে?

= যারা ইসলামকে জাহেলিয়াতের দূষিত পানি থেকে ছেঁকে পৃথক করে নিয়ে কোন না পর্যায়ে এবং তাকে তার সত্যিকার নির্ভেজাল আকৃতিতে পুনর্বার অগ্রসর করারপ্রচেষ্টা চালায় তাকে মুজাদ্দিদ বলে।

= যে ব্যক্তি দ্বীনকে নতুন করে সজ্জীবিত সতেজ করেন তাকে মুজাদ্দিদ বলে।


মুজাদ্দিদের বৈশিষ্ট্য: ১০ টি

১. স্বচ্ছ চিন্তার অধিকারী।

২. সত্য উপলদ্ধির মত গভীর দৃষ্টি সম্পন্ন।

৩. সব রকমের বক্রতাহীনতা, দোষমুক্ত, সরল বুদ্ধিবৃত্তিতে তার মনোজগৎ পরিপূর্ণ।

৪. নিজের ভারসাম্য রক্ষা করার বিশেষ যোগ্যতা সম্পন্ন।

৫. নিজের বিকৃত গতিধারার সাথে যুদ্ধ করার ক্ষমতা ও সাহস।

৬. নেতৃত্বের জন্মগত যোগ্যতা।

৭. ইজতিহাদের স্বাভাবিক যোগ্যতা।

৮. ইসলাম সম্পর্কে দ্বীধামুক্ত পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী।

৯. দৃষ্টিভঙ্গি ও বুদ্ধিজ্ঞানের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ মুসলমান।

১০. ইসলাম ও জাহেলিয়াতের মধ্যে পার্থক্য করার যোগ্যতা।


মুজাদ্দিদের কাজ: ৯ টি

১. নিজের পরিবেশের নির্ভুল চিত্রাংকন।

২. সংস্কারের পরিকল্পনাপ্রনয়ণ।

৩. নিজের সীমা পরিসীমা নির্ধারন।

৪. চিন্তারাজ্যে বিপ্লব সৃষ্টিরপ্রচেষ্টা।

৫. সক্রিয় সংস্কারপ্রচেষ্টা।

৬. দ্বীনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইজতিহাদ করারপ্রচেষ্টা।

৭. প্রতিরক্ষামূলকপ্রচেষ্টা।

৮. ইসলামী ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন।

৯. বিশ্বজনীন বিপ্লব সৃষ্টি।

একজন মুজাদ্দিদের জন্য প্রথম তিনটি কাজ অপরিহার্য্য। অবশিষ্ট ৬ টির মধ্যে যে কোন কার্য সম্পাদন করলে তাকে মুজাদ্দিদ বলা যাবে।


***মুজাদ্দিদ ও নবীর মধ্যে পার্থক্য:

নবী

১. খোদার নির্দেশে তার পথে নিযুক্ত হন এবং নিজের নিয়োগ সম্পর্কে অবগত।

২. ওহী নাযিল হয়।

৩. নবুয়্যাতের দাবীর মাধ্যমে তিনি কাজের সূচনা করে সকলকে নিজের দিকে আহবান করে।

৪. মুমীন হওয়ার জন্য নবীর দাওয়াত গ্রহন করা অপরিহার্য্য।


মুজদ্দিদ

১.প্রাকৃতিক আইনের মাধ্যমে নিযুক্ত হন এবং নিজের নিয়োগ সম্পর্কে অবগত নন।

২. ওহী নাযিল হয় না।

৩. কোন দাবীর মাধ্যমে কাজ করেন না। কিন্তু তার সৎ ও উন্নত চরিত্রের কারনে মানুষ একত্রিত হয়।

৪. মুজাদ্দিদের উপর ঈমান আনা অপরিহার্য্য নয়।


কামেল ও আদর্শ মুজাদ্দিদ:

১. এখনো কোন কামেল মুজাদ্দিদের আবির্ভাব ঘটেনি।

২. হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয (র:) এর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছিলেন কিন্তু সফলকাম হননি।

৩. একমাত্র একজনই কামেল মুজাদ্দিদ হতে পারেন যার নাম হবে ঈমামুল মেহেদী।


কিয়ামতের আগে ৫ টি পর্যায় অতিক্রম হবে

১. নবুয়্যাতের যুগ।

২. খেলাফতের যুগ।

৩. রাজতন্ত্রের যুগ।

৪. জুলুম তন্ত্রের যুগ(বর্তমান)।

৫. নবুয়্যাত পদ্ধতিতে খেলাফত প্রতিষ্ঠা।


নবীর কাজ:

১. সাধারন মানুষের মধ্যে চিন্তার বিপ্লব সৃষ্টি করা।

২. এই শিক্ষায় প্রভাবিত লোকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী দল গঠন করে জাহেলিয়াতের হাত থেকে কতৃত্ব ছিনিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা।


মুজাদ্দিদের প্রয়োজনীয়তা:

১. এই তিন ধরনের জাহেলিয়াতের ভিড় থেকে ইসলামকে উদ্ধার করে পুনরায় সবল ও সতেজ করার জন্য।

২. বিপথে পরিচালিত জীবন ধারা পরিবর্তন করে পুনর্বার ইসলামের পথে অগ্রসর করা।


কতিপয় মুজাদ্দিদ:

১. উমর ইবনে আবদুল আযীয (হিজরী: ৬১-১০১)।

২. ইমাম আবু হানিফা (র:) (হিজরী: ৮০-১৫০)

৩. ইমাম মালিক (র:) (হিজরী: ৯৫-১৭৯)।

৪. ইমাম শাফেয়ী (র:) (হিজরী: ১৫০-২৯০)।

৫. ইমাম আহম্মদ ইবনে হাম্বল (র:) (হিজরী: ১৬৪-২৪১)।

৬. ইমাম গাজ্জালী (র:) (হিজরী: ৪৫০-৫০৫)।

৭. ইমাম তাইমিয়া (র:) (হিজরী: ৬৬১-৭২৮)।

৮. শায়খ আহম্মদ সরহিন্দী (হিজরী: ৯৭৫-১০৩৪)।

৯. সাইয়েদ আহমদ বেরেলবী (হিজরী: ১২০১-১২৪৬)।

১০. শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী (হিজরী: ১১১৪-১১৭৬)।

১১. শাহ ইসমাঈল শহীদ (র:) (হিজরী: ১১৯৩-১২৪৬)।

Top


ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ সংক্রান্ত আয়াত মুখস্ত: আল-বাকারা: ২৬১, আল-ইমরান: ৯২, আল-হাদীদ: ১১। পৃষ্ঠা ৪৫০।

মুখস্থঃ


ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ: আয়াত মুখস্থ

আল্লাহর পথে ব্যয়ের (ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ) গুরুত্ব সম্পর্কিত তিনটি কুরআনের আয়াত এবং একটি হাদীস নিচে দেওয়া হলো:

১. সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত ২৬১ (প্রতিদান বৃদ্ধির উপমা) 🌳

مَثَلُ الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَهُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ كَمَثَلِ حَبَّۃٍ اَنۡۢبَتَتۡ سَبۡعَ سَنَابِلَ فِیۡ كُلِّ سُنۡۢبُلَۃٍ مِّائَۃُ حَبَّۃٍ ؕ وَ اللّٰهُ یُضٰعِفُ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ ﴿۲۶۱


২৬১. যারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি বীজের মত, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শীষে একশ শস্যদানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন। আর আল্লাহ সর্বব্যাপী প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।

২. সূরা আলে-ইমরান: আয়াত ৯২ (প্রিয় বস্তু ব্যয়ের শর্ত) ❤️

لَنۡ تَنَالُوا الۡبِرَّ حَتّٰی تُنۡفِقُوۡا مِمَّا تُحِبُّوۡنَ ۬ؕ وَ مَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ شَیۡءٍ فَاِنَّ اللّٰهَ بِهٖ عَلِیۡمٌ ﴿۹۲


৯২. তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনই কল্যাণ লাভ করতে পারবেনা; এবং তোমরা যা কিছুই ব্যয় কর, আল্লাহ তা জ্ঞাত আছেন।

৩. সূরা আল-হাদীদ: আয়াত ১১ (আল্লাহকে উত্তম ঋণ) 🤲

مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یُقۡرِضُ اللّٰهَ قَرۡضًا حَسَنًا فَیُضٰعِفَهٗ لَهٗ وَ لَهٗۤ اَجۡرٌ كَرِیۡمٌ ﴿ۚ۱۱


১১. এমন কে আছে যে আল্লাহকে দেবে উত্তম ঋণ? তাহলে তিনি বহু গুণে এটাকে বৃদ্ধি করবেন তার জন্য। আর তার জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার।

ইনফাক সংক্রান্ত হাদীস (সহীহ মুসলিম) ⚖️

عَنْ أَسْمَاءَ، قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ انْفَحِي - أَوِ انْضَحِي أَوْ أَنْفِقِي - وَلاَ تُحْصِي فَيُحْصِيَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَلاَ تُوعِي فَيُوعِيَ اللَّهُ عَلَيْكِ


আসমা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ তুমি ছি িয়ে দাও অথবা বিলিয়ে দাও অথবা ব্যয় কর। গুণে গুণে রেখ না, তাহলে আল্লাহও তোমাকে গুণে গুনে দিবেন। আর গুটিয়ে রেখ না তবে আল্লাহ ও তোমার থেকে গুটিয়ে রাখবেন। (সহীহ মুসলিমঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন-২২৪৮)

হাদিস

সুস্থ ও লোভাতুর অবস্থায় সম্পদ ত্যাগের ফজিলত

মানুষ যখন সুস্থ থাকে এবং সম্পদের প্রতি তীব্র মোহ থাকে, তখনকার দান বা ত্যাগই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি দামী।

রাবী (বর্ণনাকারী): হযরত আবু হুরায়রা (রা.)।

আরবী:

أَنْ تَصَدَّقَ وَأَنْتَ صَحِيحٌ شَحِيحٌ، تَخْشَى الْفَقْرَ وَتَأْمُلُ الْغِنَى، وَلَا تُمْهِلَ حَتَّى إِذَا بَلَغَتِ الْحُلْقُومَ قُلْتَ: لِفُلَانٍ كَذَا، وَلِفُلَانٍ كَذَا، وَقَدْ كَانَ لِفُلَانٍ

উচ্চারণ: আন তাছাদদাক্বা ওয়া আন্তা ছাহীহুন্ শাহীহুন, তাখশাল ফাক্বরা ওয়া তা’মুলুল গ্বিনা-, ওয়া লা- তুমহিল হাত্তা- ইযা- বালাগ্বাতিল হুলক্বূমা ক্বুলতা: লিফুলা-নিন কাযা-, ওয়া লিফুলা-নিন কাযা-, ওয়া ক্বাদ কা-না লিফুলা-ন।

অর্থ: (সবচেয়ে উত্তম দান হলো) সুস্থ ও লোভাতুর অবস্থায় তোমার দান করা, যখন তুমি দারিদ্রের ভয় করো এবং ধনী হওয়ার আশা রাখো। আর তুমি দান করাকে এতটা পিছিয়ে দিও না যে, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে তখন তুমি বলবে— অমুকের জন্য এতটুকু, অমুকের জন্য এতটুকু, অথচ তা তো (তোমার মৃত্যুর পর) অমুকের (উত্তরাধিকারীদের) হয়েই গেছে।

সূত্র ও হাদীস নং: সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ১৪১৯ এবং সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১০৩২।

Top


মাসয়ালা: দাফন-কাফন সংক্রান্ত

প্রশ্নোত্তরে ফিকহুল ইবাদাত দ্বিতীয় অধ্যায় - সালাত (নামায) অধ্যাপক মোঃ নূরুল ইসলাম

কাফনের হুকুম কী? এর বিধি-বিধান ও মাসআলাগুলো জানতে চাই

ক. মাইয়্যেতকে কাফন পরানো ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “তোমরা এ (মাইয়্যেতকে) কাফন পরিয়ে দাও...” (বুখারী: ১২৬৫-১২৬৮)

খ. কাফন পরানোর ফযীলত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি একজন মাইয়্যেতকে কাফন পরাবে, (কাল) কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সুন্দর ও ইরাকের (রেশমী) পোশাক পরিয়ে দেবেন। (হাকেম ১/৩৫৪, ৩৬২)

গ. কাফন সংক্রান্ত মাসাইল

১. কাফনের কাপড় ক্রয় করবে মৃত ব্যক্তির নিজস্ব সম্পদ থেকে। (বুখারী: ৪০৪৭) তবে তার সে অর্থ না থাকলে অভিভাবকেরা তাদের টাকা দিয়ে ক্রয় করে দিতে পারবে।

২. উত্তমভাবে কাফন পরানো। (মুসলিম: ৯৪৩) আর উত্তম কাফনের অর্থ হলো কাপড়টি পরিষ্কার হওয়া, পুরু বা মোটা হওয়া, সারা শরীর ঢাকে এমন হওয়া এবং মধ্যম মানের বা মাঝারি মূল্যের হওয়া।

৩. কোন কারণে কাফনের ঘাটতি থাকলে মাথা ও শরীর ঢেকে পায়ের অংশে যতটুকু বাকি থাকবে সেটুকু শুকনা কোন ঘাস দিয়ে ঢেকে দেবে। (বুখারী: ৪০৪৭, ৪০৮২)

৪. নতুন কাপড় না থাকলে পুরাতন কাপড় বা ব্যবহৃত জামাকাপড় দিয়েও কাফন পরানো জায়েয। তাছাড়া পুরুষের কাপড় দিয়ে নারীদের কাফন চলে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর লুঙ্গি দিয়ে তার কন্যা জয়নাব (রা.)-কে কাফন পরানো হয়েছিল। (বুখারী)

৫. জীবদ্দশায় নিজেই নিজের কাফনের কাপড় প্রস্তুত করে রাখতে পারে। এক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছ থেকে একটি জামা চেয়ে নিয়েছিলেন তার কাফনের জন্য এবং এটা দিয়েই তার কাফন পরানো হয়েছিল। (বুখারী: ১২৭৭)।

৬. কাফনের কাপড়টি পূর্ণ লম্বা হওয়া দরকার। যাতে মাইয়্যেতের সমস্ত শরীর ঢাকা যায়। (আলবানীর আহকামল জানায়িয, মাসআলা নং ৩৫)

৭. কাফনের কাপড়ে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্য থাকা মুস্তাহাব

(ক) কাপড়টি সাদা হওয়া। (আবু দাউদ: ৩৫২৯, বায়হাকী- ৩/২৪৫)

(খ) হিবারাহ (অর্থাৎ সূতী) কাপড় হওয়া। (আবু দাউদ: ৩১৫০)।

(গ) কাপড় তিন টুকরা হওয়া (বুখারী ও মুসলিম)। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ৩ কাপড়েই কাফন পরানো হয়েছিল। এ জন্য এর চেয়ে বেশি কাপড় ব্যবহার করাকে অনেক ফকীহ নাজায়েয বলেছেন। (আল বানীর আহকামুল জানয়িয, মাসআলা নং ৪২)। তবে কাপড়ের অভাব থাকলে এক বা দুই টুকরা কাপড় দিয়েও কাফন জায়েয আছে। সাহাবী মুসআব ইবনু উমায়ের এবং হামযা (রা.)-এর ক্ষেত্রে এমনটি করা হয়েছিল।

(ঘ) কাপড়ে তিনবার সুগন্ধি লাগানো (ইবনু আবি শাইবা- ৪/৯২) আগরবাতি দিয়ে বা। সুগন্ধযুক্ত কাঠ পুড়িয়ে বা গোলাপ পানি দিয়েও সুগন্ধময় করা যায়।

৮. হজ্জ বা উমরা পালনরত: ইহরাম অবস্থায় নিহত ব্যক্তিকে তার পরনের ২ টুকরা ইহরামের কাপড় দিয়েই কাফন পরাবে। (আবু দাউদ: ৩১৩৮) মুহরিম ব্যক্তির দেহে বা কাপড়ে কোন সুগন্ধি লাগাবে না। কেননা ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহার করা যায় না।

৯. আর জিহাদের ময়দানে নিহত শহীদের কাফন হলো তার পরিধেয় বস্ত্র। শহীদের পরনের কাপড় খোলা জায়েয নেই। নিজের রক্তমাখা পোশাকই তার কাফন, এ পোশাকেই তাকে কাফন করাতে হবে। এভাবেই উহুদ যুদ্ধের শহীদদের দাফন করা হয়েছিল। (আহমাদ: ২৩১৪৪)

১০. কাপড়ের মাপ: মাইয়্যেতের দেহের প্রস্থ ৩০ সে মিঃ হলে কাফনের প্রস্থ ৯০ সে মিঃ হতে হবে। এইভাবে ৪০ সে মিঃ'র ক্ষেত্রে ১২০ সে মিঃ, ৫০ সে মিঃ'র ক্ষেত্রে ১৫০ সে মিঃ, ৬০ সে মিঃ’র ক্ষেত্রে ১৮০ সে মিঃ অর্থাৎ ৩ গুণ হবে। মাইয়্যেতের দেহের দৈর্ঘ্য ১৮০ সে মিঃ হলে লেফাফার দৈর্ঘ্য এর চেয়ে ৬০ সে মিঃ অতিরিক্ত হতে হবে। তদনুরূপ ১৫০ সে মিঃ’র ক্ষেত্রে ৫০ সে মিঃ, ১২০ সে মিঃ’র ক্ষেত্রে ৪০ সে মিঃ এবং ৯০ সে মিঃ'র ক্ষেত্রে ৩০ সে মিঃ কাপড় বেশি লম্বা লাগবে। (জানাযা দর্পন, পৃ. ফাইযী, পৃ. ৫৭)।

সুত্র: go

Top

"সর্বস্বত সংরক্ষিত© ২০২৩ এস এম হোমিওপ্যাথি মেডিকেল সেন্টার; ব্লগঃ ডিজাইনে SIAAM