যখন কোনো ব্যাক্টেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে জিহ্বার প্রদাহের সৃষ্টি হয়, তখন উহাকে গ্লোসাইটিস বলা হয়। গ্লোসাইটিস (Glossitis) ইংরেজি শব্দ, এর অর্থ হল জিহ্বার প্রদাহ।
জিহ্বা হল ছোট পেশীবহুল মুখের অঙ্গ, যার সাহায্যে চর্বণ এবং গলধঃকরণ ও কথা বলা হয়। জিহ্বা সাধারণত পরিপাক ক্রিয়ার অবস্থা পরিজ্ঞাপক হলেও ইহা একটি স্বতন্ত্র ইন্দ্রিয়। সুতরাং পরিপাক ক্রিয়ার গোলযোগ না ঘটলেও জিহ্বায় অনেক প্রকার রোগ হতে পারে। যদি জিহ্বার আকার স্ফীত হয়, রং পরিবর্তন হয়, ব্যথা হয়, এর পৃষ্ঠের উপর মসৃণ চেহারার বিকাশ ঘটায় এবং খেতে অথবা কথায় পরিবর্তন করতে পারে, তাকে জিহ্বার প্রদাহ বলা হয়।
অন্যভাবে কোনো কারণে জিহ্বা ফুলে উঠলে এবং লালবর্ণ হলে, তাতে টাটানি বেদনা, দপদপ করা বেদনা ও জ্বালা এবং গরমবোধ হলে তখন তাকে গ্লোসাইটিস বা জিহ্বার প্রদাহ বলা হয়। প্রদাহের সাথে সামান্য মাথাধরা, শীতবোধ এবং সময় সময় জিহ্বায় পূঁজ জমে থাকে।
গ্লোসাইটিসের অন্য নাম হল:
- Tongue inflammation
- Tongue infection
- Smooth tongue
- Glossodynia
- Burning tongue syndrome ইত্যাদি।
গ্লোসাইটসের প্রকারভেদ
গ্লোসাইটিস বিভিন্ন ধরনের হয়। যেমন:
- একিউট গ্লোসাইটিস (Acute Glossitis)
- ক্রনিক গ্লোসাইটিস (Chronic Glossitis)
- ইডিওপ্যাথিক গ্লোসাইটিস (Idiopathic Glossitis)
- অ্যাট্রপিক গ্লোসাইটিস (Atrophic Glossitis)
১। একিউট গ্লোসাইটিস (Acute Glossitis)
একিউট গ্লোসাইটিস হল জিহ্বার প্রদাহ, যা হঠাৎ করে মারাত্মক লক্ষণ প্রকাশিত হয়। এই ধরনের গ্লোসাইটিস সাধারণত অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার সময়কালে বিকাশ লাভ করে।
২। ক্রনিক গ্লোসাইটিস (Chronic Glossitis)
ক্রনিক গ্লোসাইটিস হল জিহ্বার প্রদাহ, যা নিয়মিত পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। এই ধরনের আরেকটি স্বাস্থ্য অবস্থার লক্ষণ হিসেবে শুরু হয়।
৩। ইডিওপ্যাথিক গ্লোসাইটিস (Idiopathic Glossitis)
ইডিওপ্যাথিক গ্লোসাইটিস হান্টারস গ্লোসাইটিস নামে পরিচিত, যা জিহ্বার পেশীর উপর প্রভাবিত করে। এই অবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্যাপিলা (Papillae) নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ইডিওপ্যাথিক জিহ্বার প্রদাহের কারণ অজানা।
৪। অ্যাট্রপিক গ্লোসাইটিস (Atrophic Glossitis)
অ্যাট্রপিক গ্লোসাইটিস ঘটে যখন বেশি সংখ্যক প্যাপিলা (Papillae) নষ্ট হয়ে যায়, এর ফলে জিহ্বার রক্ত এবং গঠন বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন হয়। এই ধরনের গ্লোসাইটিসের সাধারণত জিহ্বার গাঢ় লালবর্ণে রূপান্তরিত হয়।
গ্লোসাইটিসের কারণ
জিহ্বা প্রদাহ বা গ্লোসাইটিসের অনেক কারণ রয়েছে যা নিম্নরূপ:
অ) মায়াজমেটিক কারণ
- সোরা (Psora)
- সিফিলিস (Syphilis)
- সাইকোসিস (Sycosis)
- টিউবারকুলার ডায়াথেসিস (Tubercular diathesis)
আ) আনুষঙ্গিক কারণ
- ব্যাকটেরিয়া, ঈষ্ট বা ভাইরাসের সংক্রমণে।
- হরমোনাল কারণ।
- ওরাল সেক্স।
- পোড়া, রুক্ষ দাঁত এবং গালে কামড় লাগা ইত্যাদি আঘাত লাগার কারণে।
- আয়রন, ভিটামিনের অভাবের কারণে।
- অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া হতে যেমন- টুথপেস্ট, মাউথওয়াশ, Breath fresheners, রং মিশ্রিত চকলেট, কৃত্রিম দন্ত প্রভৃতি।
- পানে চুনের পরিমাণ বেশি খাওয়ার কারণে।
- দাঁতের ব্যাধির পূঁজ জিহ্বায় লাগা।
- ঠান্ডা লাগা, জ্বর, দুর্বলতা, জিহ্বার আঘাত ও অজীর্ণ রোগ।
- অতিরিক্ত পারদ সেবন।
- উগ্র জাতীয় খাদ্য।
- পুরাতন উদারাময়।
- তামাক, অ্যালকোহল, গরম খাবার, মসলাযুক্ত খাবার ইত্যাদির কারণে।
গ্লোসাইটিসের লক্ষণ
এই রোগের লক্ষণ নির্ভর করে প্রদাহের কারণের উপর। জিহ্বা প্রদাহের লক্ষণগুলো দ্রুত বা ধীরে ধীরে প্রদর্শিত হয়। লক্ষণ পরিবর্তনশীল এবং বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন লক্ষণ থাকতে পারে। যে সব লক্ষণ দেখা যায় তা হল:
- জিহ্বার ব্যথা বা স্পর্শকাতরতা।
- জিহ্বা ফুলে ওঠে এবং মসৃণ দেখায়।
- জিহ্বার রং পরিবর্তন হয়ে গাঢ় লালবর্ণ হয়।
- কথা বলা, খাওয়া ও গলধঃকরণে অক্ষমতা বা কাঠিন্য বা কষ্ট হয়।
- জিহ্বার উপরের প্যাপিলা নষ্ট হয়ে যায়, জিহ্বার উপর মসৃণ হয়ে যায়।
- মুখে ঘা ও ক্ষতকর।
- সামান্য মাথা ধরা, শীতবোধ এবং সময় সময় জিহ্বায় পূঁজ দেখা যায়।
- গলা ক্ষত।
- পিপাসা বৃদ্ধি পায়।
- মুখের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।
- জিহ্বা হতে লালা ক্ষরণ হতে থাকে।
- জিহ্বার পেছনে একটি ক্ষুদ্র স্ফোটক হয়ে ক্রমশ পাকে এবং ফাটিয়া যায়।
- জিহ্বা অনেক বেশি জ্বালা হয়।
- অনেক সময় শ্বাসরোধের উপক্রম হয়।
- কখনো কখনো ছোট ফুসকুড়ি হয়, তার জন্য জিহ্বা নাড়তে কষ্ট।
- ঝাল, লবণ, মশলাযুক্ত খাদ্য ও গরম খেলে খুব বেশি কষ্ট হয়।
- অনেক সময় জিহ্বা খুব বড় বড় গর্ত হয় অথবা ফেটে যায়, মাঝে মাঝে তাতে পূঁজ দেখা যায়।
- জিহ্বার প্রদাহের জন্য মাথা ব্যথা, জ্বর, কিছু খেতে পারে না, দুর্বল হয়ে যায়।
জিহ্বা প্রদাহের ঝুঁকির কারণ
- মুখে আঘাত।
- মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া।
- আলগা দাঁতগুলোর জন্য জ্বালাতন হয়।
- হারপিস জোস্টার আছে।
- ওরাল সেক্স।
- আয়রনের মাত্রা কমে যায়।
- শুকনো মুখ (Dry Mouth)।
- খাদ্যে অ্যালার্জি আছে।
- ইমিউন সিস্টেমে বিশৃঙ্খলতা।
রোগানুসন্ধান (Investigation)
- Blood CBC
- ESR
- C/S, R/S, TC, DC
ভাবীফল
সঠিক সময় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা হলে রোগী আরোগ্য হয়। যদি জিহ্বায় আংশিক প্রদাহ হয়, তাহলে প্রদাহের ফোস্কা ফাটিয়া গিয়ে রোগ আরোগ্য হয়। যদি রোগ সামগ্রিক হয় এবং যদি জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং গলনালী রুদ্ধ হয়ে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
প্রতিরোধ (Prevention)
- ওরাল হাইজিন বজায় রাখতে হবে।
- ওরাল সেক্স বন্ধ করতে হবে।
- দাঁত ব্রাশ করতে হবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দিনে দুইবার এবং ফ্লস অন্তত একবার করতে হবে।
- খাদ্যতালিকা পরিবর্তন এবং সম্পূরক খাদ্য ব্যবহার করে রক্তস্বল্পতা এবং পুষ্টির ঘাটতির চিকিৎসা করতে হবে।
- জ্বালাকর খাদ্য এড়িয়ে চলতে হবে যেমন- গরম খাবার, মসলাযুক্ত খাবার, অ্যালকোহল এবং তামাক ইত্যাদি, তাহলে জিহ্বার অস্বস্তিবোধ কমবে।
- নিয়মিত মুখের স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখতে হবে।
- স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস করতে হবে।
- আয়রন, ফলিক এসিড এবং ভিটামিনের অভাব দূর করতে হবে।
ব্যবস্থাপনা (Management)
চিকিৎসার লক্ষ্য হল প্রদাহ কমানো। পাশাপাশি ব্যথা ও জ্বালাকর অস্বস্তি বোধ কমানো গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ মানুষ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করা প্রয়োজন মনে করে না যতক্ষণ পর্যন্ত মারাত্মক অবস্থা না হয়।
অ) ঔষধ (Medicine)
লক্ষণসাদৃশ্য নিম্নলিখিত হোমিওপ্যাথি ঔষধ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন- মার্ক-সল, মার্ক ভাইভাস, বোরাক্স, এপিস মেল, এনথ্রাকসিনাম, আর্সেনিক, এসিড নাইট্রিক, হিফার সালফার, আর্টিকা ইউরেন্স, ল্যাকেসিস, কার্বোভেজ, মার্ক বিন আয়োড, হাইড্রাসটিস, সিফিলিনাম, সরিনাম, টিউবার-কুলিনাম, বেলেডোনা ইত্যাদি।
আ) উপদেশ (Advice)
১) করণীয়
- আহার করার পর ভালোভাবে মুখ পরিষ্কার করতে হবে।
- কোষ্ঠ্য পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
- বিশুদ্ধ বায়ুতে ভ্রমণ।
- মৃদুগরম পানি ব্যবহার করতে হবে।
- সময়মত আহার করতে হবে।
- ভিটামিনের অভাব দূর করতে হবে।
- ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে।
২) নিষেধ
- ক্ষারজাতীয় খাদ্য।
- মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য।
- তৈলাক্ত বা ঘৃতপক্ক খাদ্য।
- ধুমপান, মদ্যপান, মসলাযুক্ত খাদ্য।
- আয়োডিন, আর্সেনিক, মার্কারীর অপব্যবহার।
৩) পথ্য (Diet)
- সাগু, বার্লি, টাটকা দুগ্ধ প্রভৃতি তরল খাদ্য দিতে হবে।
- দুধ, শীতল বা সামান্য উষ্ণ পানীয় পান করতে হবে।
- ঝাল ছাড়া খাদ্য দিতে হবে।
- সবুজ টাটকা শাক-সবজি দিতে হবে।
দ্রষ্টব্য: উপরে বর্ণিত তথ্যটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে। গ্লোসাইটিস একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা। কোনো প্রকার চিকিৎসা বা ঔষধ গ্রহণের পূর্বে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
------চিকিৎসকঃ- --
ডাঃ এ.আর. খান
🔼
জিহ্বার Squamous Cell Carcinoma — সহায়ক হোমিওপ্যাথি
এই পাতাটা শিক্ষামূলক — ক্যান্সার রোগীর জন্য হোমিওপ্যাথি কেবল সহায়ক হতে পারে। প্রধান চিকিৎসা হিসেবে অনকোলজি ও সার্জারি আবশ্যক।
জরুরি সতর্কতা:
কোনো রোগীর কাছে শুধুমাত্র হোমিওপ্যাথি দিয়েই ক্যান্সার বন্ধ রাখা বিপজ্জনক। রোগীকে অবিলম্বে ENT/Head & Neck Oncology-তে রেফার করা উচিত; বায়োপসি ও স্টেজিং অপরিহার্য।
প্রধান সহায়ক রেমেডি (সংক্ষিপ্ত)
Condurango
ইন্ডিকেশন: মুখ/জিহ্বার ম্যালিগন্যান্ট আলসার, অস্বাভাবিক টিস্যু বৃদ্ধি।
- Mother Tincture: Condurango Q — 10–15 drops, 2 বার দৈনিক (অর্ধ কাপ পানি মিশিয়ে)
Hydrastis
ইন্ডিকেশন: ম্যালিগন্যান্ট আলসার, সেক্রেশন/ক্ষুধা কমে যাওয়া, লিম্ফ নোড ইনভলভমেন্ট।
- Hydrastis Q — 10 drops, 2 বার দৈনিক
- Hydrastis 200 — সপ্তাহে ১ ডোজ (ক্লিনিকাল সিদ্ধান্ত অনুযায়ী)
Kali cyanatum (Kali Cy.)
ইন্ডিকেশন: তীব্র ব্যথা, জ্বালা, রক্ত/দুর্গন্ধসহ আলসার।
- Potency: Kali Cy. 6 বা 30 — প্রয়োজন অনুযায়ী
Phytolacca
ইন্ডিকেশন: গভীর ব্যথাযুক্ত আলসার, লিম্ফ নোড ব্যথা।
- Phytolacca Q — 10 drops, 2–3 বার দৈনিক
Carbo animalis
ইন্ডিকেশন: মুখ থেকে দুর্গন্ধ, দুর্বলতা, ক্লান্তি।
- Carbo animalis 30 — দিন/herbal supportive এর সঙ্গে
Arsenicum album
ইন্ডিকেশন: যন্ত্রণা, দুর্বলভাবে উত্তেজিত, জ্বালা, ভয় ও উদ্বেগ।
- Ars. Alb. 30 — ১–২ বার দৈনিক (পেইন/অ্যানজাইটি কমাতে সাহায্য করে)
Silicea
ইন্ডিকেশন: suppuration-র সাপোর্ট, ক্ষত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
- Silicea 6X — দৈনিক, Silicea 200 — সপ্তাহে ১ ডোজ (প্রয়োজনে)
Thuja
ইন্ডিকেশন: এপিথেলিয়াল অস্বাভাবিকতা, wart-like growths, chronic lesions।
- Thuja 200 — semanal (ক্লিনিকাল ডিসক্রিশন অনুযায়ী)
প্রস্তাবিত ক্লিনিক্যাল কম্বিনেশন
Mother Tincture Support (নিরাপদ):
- Condurango Q — 10 drops
- Hydrastis Q — 10 drops
- Phytolacca Q — 10 drops
- → অর্ধ কাপ পানি মিশিয়ে দিনে ২ বার খেতে বলুন।
Potency / Weekly Support:
- Arsenicum album 200 — সপ্তাহে ১ ডোজ (পেইন/অ্যানজাইটি অনুযায়ী)
- Hydrastis 200 — সপ্তাহে ১ ডোজ (প্রসেস মনিটর করলে)
ক্লিনিক্যাল পরামর্শ ও অন্যান্য ব্যবস্থা
- রোগীর বায়োপসি রিপোর্ট ও স্টেজিং দেখে অনকোলোজি রেফার করুন।
- খাবার খেতে কষ্ট হলে পুষ্টি সাপোর্ট (প্রোটিন-রিচ লিকুইড) নিশ্চিত করুন।
- মুখ পরিষ্কার রাখতে warm saline বা Calendula Q মিশানো গর্গল/কুলকুচি দিন।
- ধূমপান/তামাকজাত দ্রব্য, সুপারি ইত্যাদি সম্পূর্ণ বন্ধ করুন।
- পেইন ও সিলিং—প্রয়োজনে পেইন কন্ট্রোল/এন্টিবায়টিক রেফার করুন।
- হোমিওপ্যাথি শুধু supportive; প্রধান থেরাপি (surgery/radiation/chemotherapy) উপরোক্ত হয়—রোগীর সাথে সহযোগিতায় কাজ করুন।